আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ছোট ও উন্নয়নশীল শ্রম রফতানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। স্বল্পমেয়াদে রেমিট্যান্স বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিতে পড়ছে দেশীয় শ্রমিক, প্রবাসী আয় ও উৎপাদন শিল্প।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স ও অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়। বিআইডিএস আয়োজিত এ সেমিনারে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ড. একেএম মাহবুব মোরশেদ।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক রেমিট্যান্স গত দুই দশকে বিশ্ব জিডিপির দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দশমিক ৭৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৪৬ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
তাদের বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরই মধ্যপ্রাচ্যসহ তেলসমৃদ্ধ দেশে উৎপাদন ও শ্রমঘণ্টা বাড়ে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের আয় তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে প্রথম ধাক্কায় রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। মজুরি বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত কাজের সুযোগে বিদ্যমান প্রবাসীরা (ইনটেনসিভ মার্জিন) বেশি শ্রম জোগান দেন, ফলে রেমিট্যান্সের দ্রুত উত্থান হয়। কিন্তু এ সুবিধা বেশি সময় স্থায়ী হয় না।
সেমিনারে গবেষকরা জানান, উচ্চ মজুরির সম্ভাবনা দেখে শ্রম পাঠানো দেশগুলো থেকে নতুন শ্রমিকরা দ্রুত বিদেশে যেতে শুরু করে, যাকে বলা হয় ‘এক্সটেনসিভ মার্জিন’। ফলে বিদেশে শ্রমের সংখ্যা বাড়তে থাকলে বাজারে শ্রমের সরবরাহ বেড়ে যায় ও এক সময়ে বিদেশী শ্রমিকদের গড় মজুরি কমতে শুরু করে। অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রথমে বাড়লেও পরে আবার ওঠানামা করে ও স্থিতিশীলতা হারায়।
গবেষণা বলছে, এ ওঠানামার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন পুরনো প্রবাসী শ্রমিকরা। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ে শ্রম রফতানিকারক দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। উচ্চমূল্যে আমদানীকৃত জ্বালানি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, শিল্পে ব্যয় বাড়ে, ভোগ কমে ও দেশীয় আয়ের ওপর চাপ বাড়ে।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. একেএম মাহবুব মোরশেদ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা কিছুটা বাড়ে, কিন্তু একই সময়ে দেশকে জ্বালানি তেল কিনতে বেশি ব্যয় করতে হয়। এতে শেষ পর্যন্ত দেশের লাভ-ক্ষতির হিসাবটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে প্রবাসী আয় বাড়ার ফলে জ্বালানি তেলের দামের চাপ পুরোপুরি দেশের ওপর পড়ে না, এ অতিরিক্ত আয় কিছুটা ঢাল বা সুরক্ষার মতো কাজ করে, যা অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচায়।’
অর্থনীতির এ অধ্যাপক আরো বলেন, ‘শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়; এজন্য দীর্ঘমেয়াদে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এসব দক্ষতা চাকরির সুযোগ সহজ করে ও উচ্চ আয়ের পথ খুলে দেয়।’